Saturday, March 17, 2012

প্রেতাত্মার প্রাণ ...(২)


নিলাদ্রি বলল - যারা আজ নেই তাদের সাথে কথা বলতে হলে উজান বেয়ে সময়ের উল্টো রাস্তায় হাঁটা দেওয়া ছাড়া ... সত্যি, কি অমোঘ। মাঝে মাঝেই মনের তারে মীড়ের টান - তখন উচাটন মন - যদি হত যদি এমন হত আমি সময়ের উজান পেছন পানে নয়,  সময়ের উল্টো দিক থেকে হাঁটতে হাঁটতে আজকের দিকে ফিরতাম, তাহলে ওই সব সময়ের কাছাকাছি হলে হাতের গেলাসটা নামিয়ে রেখেই বলতাম - চল শিবাজি আবার হারাই।

হয় না, সে আর হয় না। সময় একার নয়, একাকী তো নয়ই
সময় বহতা থাকে - আমি শুধু নেশাতুর ফিরে যাই সেই বাঁকে 

আমাদের মেসের একটা দারুণ বারান্দা ছিল। মেরে কেটে দুটো চেয়ার আর একটা টুল পাতা যেত আর দূরের মানে বারান্দার দরজা থেকে দূরের চেয়ারটাতে বসতে হলে বা বসা থেকে উঠে আসতে হলে সামনের জনকে বেশ সন্ত্রস্ত হতে হত, কারন প্রায় কোল ডিঙ্গিয়ে আসতে হত।
তো সেই বারান্দায় আমি আর অচিন গরমকালের এক সন্ধ্যেয় বিয়ার নিয়ে বসেছি, কতই বা পেতাম তখন, তারি মাঝে একটু আধটু ওই সব মানে লাক্সারি আর কি। হলঘরের অন্যপ্রান্তে জ্বলা একটা বাল্বের আলোয় বিরাট লম্বা ছায়া ফেলে নভেন্দু'দা হাজির। অন্ধকার হয়ে গেছে বাইরের আকাশ। বারান্দায় দরজাতে পা রেখেই সামনে টুলে রাখা বিয়ারের বোতলটা হাতে নিতেই অচিন বলল ঢাল না ঢেলে নাও। বলেই একটু খিক খিক করল। অচিনের ওই খিক খিক টা খুব গায়ে জ্বালা ধরানর মত, দেখি নভেন্দু'দা খুব গম্ভীর গলায় বোতলটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলছে - "আমি ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করি না। খেয়াল করি নি অচিনের সাথে গল্প করতে করতে যে ও বার দুএক ঢেলে বোতল টা খালি করে দিয়েছে। আমি ব্যাস্ত হলাম নভেন্দু'দা কে আমার বোতলটা এগিয়ে দিতে, আর ঠিক তখনি অচিনের আর একটা গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো মন্তব্য - "কিন্তু ছুঁচোটার তো স্বর্গলাভ হতে পারতো, ওই হাতে মরে।।" 

ঠা ঠা করে হেসে ওঠা নভেন্দু'দার দরাজ স্বর - ছাদের দু একটা পায়রা ঝট পট করে জায়গা বদল করল। "শুয়ার বোতল শেষ করে দিয়ে এখন রস ঢালছ..."  দু একটা আরও অশ্রাব্য অশ্লীল কথা, তারপর আমার বোতলে চুমুক।

নভেন্দু সেন। কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল। পাশ টাস করে বিয়ের পর প্রয়োজনের তাগিদে ষ্টীল সিটির স্কুলে আর্ট এর টিচার । আমাদের আর আমাদের মতো অনেকের জীবনে লোকটা ছিল এক ঐশ্বরিক উপস্থিতি। না প্রভার দ্যূতিতে নয়, প্রাণের। ছোটো খাট লোকটার ছিল অদম্য প্রাণশক্তি, আর সেটা খরচাও করত চার হাতে। ও ছিল আমাদের স্বপ্ন কারিগর, ও না হলে আমাদের আড্ডা খুব সহজেই মিইয়ে যেত। 

আমরা প্রায়ই মধ্যরাতের শেষ যামে বোতল খালি হলে তিন চারজন - শিবাজি আমি অচিন দেবাশীস অলক - আমরা যেতাম ওকে ওঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতে, অনেক সময় হয়েছে ওঁর বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডার মায়া কাটাতে পারছি না, আর তখন দোতলার জানলার ফাঁক দিয়ে একটা আওয়াজ আসত - আড্ডা টা শেষ করে আসলে হতো না এখানে, এ বাড়ির আর সবাই কেও কি ঘুমতে দেবে না তোমরা। ভদ্রমহিলা আসলে কি এক অদ্ভুত জীবনের চলার ছন্দে নভেন্দু'দার সব কিছুকেই মনে নিয়েছিলেন, মেনে নয়, আর তাই এতো অনাচারে অত্যাচারের পরেও আমরা কোনদিন তাঁর কাছে ব্রাত্য হই নি।

নভেন্দু'দা মারা যাওয়ার পর তাঁর কাছে যেতে পারিনি, সাদা কাপর পড়া তাকে দেখতে পারব না বলে। সাদা হয়ত উনি পরেন নি, কিন্তু নভেন্দু'দা ছাড়া উনি - সামনে যেতে পারি নি। ওঁর বড় মেয়ে ফোন করেছিল - কাকু আসবে না? বলেছিলাম - না রে পারব না...। মেয়েটাও নভেন্দু'দার মেয়ে তো নভেন্দু'দার মতই আর তাই অল্প হেসেছিল ফোনের ওপার থেকে - আচ্ছা।

ভেতরের যে বিশ্ব আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, কখনো কখনো সেটা এতো গুরুভার।

No comments:

Post a Comment