Saturday, March 17, 2012

প্রেতাত্মার প্রাণ ... (৪)


চৈত্রের দুপুর ঘর বাঁধবার খড় খুঁজতে বেরিয়েছে একঝাঁক চড়াই বাবুই শালিখ, ওদের বুকের হলুদ রঙ যেন কেমন একটু ফ্যাকাসে। ওরা কি তৃষ্ণার্ত না এক বুক দুঃখের ভারে ফ্যাকাসে হয়েছে! মাথার ওপরে আকাশ একিই সঙ্গে চণ্ডালের রাগ নিয়ে দাউ দাউ আবার ডোমের নিঃস্পৃহতায় খুঁচিয়ে চলেছে আগুনের ধার আর ওদের ওড়ার ভাষায় ক্লান্তি।

ঠেক আর ঠিকানা, একটা রোজ দিনের শেষে বা রাত ভজিয়ে দাসভিদানিয়া বলে উঠে এসেও ফিরে বসার জায়গা, আর অন্যটা সেই অচিনপুর - থাকে বলেই ঠেকের প্রাণে বিষের জাদু কুসুম গন্ধ নাহয় প্রেমের হলুদ নীল বা তাল সুপুরির লম্বা ছায়া লাল সবুজের ভয়াল নিশান পদ্মদীঘির শান বাধান ঘাটলা জেগে থাকে। ওই ঠিকানার সন্ধান করতে করতেই এক জীবনে কারুর জীবন হয় উলানোভার মরালনৃত্য, আর কারুর জন্য ফুটপাথে ব্রিজের নীচে বাঁধা ঘরের শুকনো হাঁড়িতে ইঁদুরের মাথা ঠোকা, তলপেট পড়ে গেছে তলপেটেরও নীচে, বোবা জন্তুর ক্ষিদে চোখে মুখে। 

আকাশের আর মাটির চিড়িয়ারা একিই সন্ধানে মাতে সময়ের ভাঁজে। আর আমি দেখতে দেখতে ক্লান্ত গোধূলি ছুঁয়েছি, শালিখ তুমি মনে রেখ, আর ফুটপাথে পাইপের ঘরে ব্রিজের নীচে মানুষ তুমি ঠোঁট টিপে হাসছ, হাসবেই তো, ক্যাসুয়াল লিভ নিয়ে বিপ্লবে নামি আর তারপর সাগর সৈকতে বা পাহারের খাঁজে অবসর বিনোদন, ক্লান্তির ধুলো ঝেরে ফেলতে, আর তার মাঝে কিছু আধাসচেতন মনের ক্লান্তি অনুতাপের টেলিপ্রিন্টারে শব্দ তোলে -  আর কতদিন, আয়নায় বিবর্ণ মুখ। সুতরাং দেখা গেল কেউই সুখী নয়...নাকি এও আর এক দুঃখ দুঃখ খেলা!!!

কুঁয়োর ব্যাঙের কাছে কুঁয়োর মাথায় ঝুলে থাকা আকাশটাই ব্রহ্মাণ্ড আর মেড়ের দেয়ালের জমা শেওলা সাগরপারের অচিন বিস্ময় - কলম্বাসও বোধহয় এতটা বিস্ময় নিয়ে রোজ নতুন ভূখণ্ড দেখে নি। মাথার ওপর মাধ্যন্দিনের সূর্য তাঁর রক্তে ডাক দিলে গলগণ্ড ফুলিয়ে ষে গান গায় শিল্প করে।

বহুপরিচর্যাজাত তবু থাকি পরিচয় হীন,  তারি খোঁজে ছোটাছুটি, দূরে কাছে সদরে অন্দরে, দীর্ঘ সময়ের বুকে ঘোরাঘুরি ছোটাছুটি করে ফিরে এলে পরে যার দেখা পাই তাঁর পরিচয়ে ভরে না হৃদয়,শুধু বুকের আকাশ জুড়ে জমে ওঠে মেঘ,জলহীন সেই মেঘে বৃষ্টিও নামেনা। তবু ভালোলাগা থাকে এ এক আশ্চর্য বিস্ময়... ভালোলাগা
বাসন্তী গাছের মতই...ফুল দিয়ে ঋতু শেষে ঝরে যায়, মরে যায় বীজ ছেড়ে যায়, বার বার ঋতুমতী হতে...

 বোধ আর ভাবের এই দীর্ঘসূত্রী দ্বৈত চুড়ায় আমি এক দীর্ঘসূত্রী দ্বৈপায়নী হ্যামলেট - টু বি অর নট টু বি'র পাঞ্জালড়াইয়ে সারাক্ষণ কাঁপছি আর কাঁপছি।

প্রেতাত্মার প্রাণ ... (৩)


আনকাহিনীর টান - ছট ছট মনের আয়নায় উঁকি দিলাম প্রতিবিম্ব বলল দাঁড়াও, একটু সেজে নিই তারপর... হবেই তো অনেক আনকাহিনীর টানাপোড়েন তাই সব কিছু আলুস ঝুলুস, গল্প কথা দেখা দেয় কি করে এমন দুম করে।

মন কি ইচ্ছে করলেই সব কাহন কাহন গল্প ফিরিয়ে দিতে পারে! হয় না হয় না সেটা, এরকম সময়েই আলু থালু চিত্ত বলে দাঁড়াও, সবুর, একটু সেজে নিই তারপর দেখ'খন আর আমি তখন সব ছেড়ে বসে থাকি ধৈর্য পরীক্ষায়। কখন মন দেখা দেবে একটু সেজে একটু গুজে আনকাহিনীর ভ্রমর কথা - অনেক হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি, অনেক নিহত প্রেমের নিভে যাওয়া ফানুস অনেক দুরের দিনের মেঘের রঙ ময়ূরপঙ্খি আনকাহিনী, অনেক সাধ সাধ্যের আড়াআড়ির ফেরিওয়ালা হাঁক আরও কত কিছু - রত্নাকর ছেড়ে গেছে ধুলভরা মনের জাঙালে, মন ভামিনী বিলাসিনী নাগরির মত অপাঙ্গে হাসবে ...কি গো নাগর কি খুঁজছ!

তখন একটা আধটা টুকরোই নাগালে আসে, একসঙ্গে অনেকগুলো নয়, সেটা হলে যেন সেই প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলো দশজনা সব মুখেতেই ছায়া থাকায় কাউকেই পুরো দেখা হয় না। দশজন দশকথা আনকথা আর সারা হয় না তাদের সাথে।

একবার তো সেই আনকাহিনীর খোঁজে বেরিয়ে অসমাপ্ত অসম্পূর্ণ ছবির চিতায় আগুন দিতে গিয়ে আমারই মতো অপেক্ষারত আরেক মানুষ দেখে চমকে উঠেছিলাম - ভিখিরির মত শ্মশানে লোকটা কি করছে? ভীষণ ভয়ে মুখটা পরিষ্কার দেখতেও চাইনি, পালিয়ে এসেছিলাম... আমার ছায়া নয় তো!

মনে আছে দৌড়ে পালিয়ে আসার সময় পেছন পানে তাকাতেই দেখেছিলাম সেটা উঠে পড়ে দুলকি চালে হেঁটে আসছে আমার দৌড়ে পালানো রাস্তা ধরে। ভয় টা অনেকদিন ছেঁকে রেখে ছিল। আনকাহিনীর ভামিনীর দরজা মাড়াতে গেলেই শ্মশানের ছায়াটার দুলকি চাল - এ যেন পুরাণ  কথার না চাওয়া গন্ধর্ব বিবাহের জের।

খিদে তো মরে না আনকাহিনীর, একদিন ছায়াটাই ক্লান্ত হয়ে গেলো, কত আর পেছু নেবে। আমিও ফিরলাম স্মৃতির জনতাবধুর স্তন রস নিংড়ে নিতে - নাহ হ এ যেন বাখের ডাবল কনচের্তো ই মেজরে বাজান হয়ে যাচ্ছে, আনকাহিনীর বেসুর পছন্দ নয়, মৃদু কণ্ঠে বলল - উইল ইউ স্টপ ইট!  অস্ফুটে বলা কথা কিন্তু মনে হল সেটাই যেন আকাশ আছড়ান প্রতিবাদ। আবার ভয় পেলাম ঠিকানা হারান মানুষরা যেমন পায়। 

নাহ আজ আর ভালো লাগছেনা। তপ্ত নই তৃপ্ত নই স্মৃতির গম্বুজ শুধু ডালা খোলা ভয়ের তোরঙ - অভাবের অনুভাব স্মৃতির জাঙালে। 
ঘুম কেড়ে নেওয়া নির্লজ্জ রাতটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ছাড়ব না, আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাসী, আমি আবার ফিরব এখানে ভামিনী এ যে আমার মানবজমিন।

প্রেতাত্মার প্রাণ ...(২)


নিলাদ্রি বলল - যারা আজ নেই তাদের সাথে কথা বলতে হলে উজান বেয়ে সময়ের উল্টো রাস্তায় হাঁটা দেওয়া ছাড়া ... সত্যি, কি অমোঘ। মাঝে মাঝেই মনের তারে মীড়ের টান - তখন উচাটন মন - যদি হত যদি এমন হত আমি সময়ের উজান পেছন পানে নয়,  সময়ের উল্টো দিক থেকে হাঁটতে হাঁটতে আজকের দিকে ফিরতাম, তাহলে ওই সব সময়ের কাছাকাছি হলে হাতের গেলাসটা নামিয়ে রেখেই বলতাম - চল শিবাজি আবার হারাই।

হয় না, সে আর হয় না। সময় একার নয়, একাকী তো নয়ই
সময় বহতা থাকে - আমি শুধু নেশাতুর ফিরে যাই সেই বাঁকে 

আমাদের মেসের একটা দারুণ বারান্দা ছিল। মেরে কেটে দুটো চেয়ার আর একটা টুল পাতা যেত আর দূরের মানে বারান্দার দরজা থেকে দূরের চেয়ারটাতে বসতে হলে বা বসা থেকে উঠে আসতে হলে সামনের জনকে বেশ সন্ত্রস্ত হতে হত, কারন প্রায় কোল ডিঙ্গিয়ে আসতে হত।
তো সেই বারান্দায় আমি আর অচিন গরমকালের এক সন্ধ্যেয় বিয়ার নিয়ে বসেছি, কতই বা পেতাম তখন, তারি মাঝে একটু আধটু ওই সব মানে লাক্সারি আর কি। হলঘরের অন্যপ্রান্তে জ্বলা একটা বাল্বের আলোয় বিরাট লম্বা ছায়া ফেলে নভেন্দু'দা হাজির। অন্ধকার হয়ে গেছে বাইরের আকাশ। বারান্দায় দরজাতে পা রেখেই সামনে টুলে রাখা বিয়ারের বোতলটা হাতে নিতেই অচিন বলল ঢাল না ঢেলে নাও। বলেই একটু খিক খিক করল। অচিনের ওই খিক খিক টা খুব গায়ে জ্বালা ধরানর মত, দেখি নভেন্দু'দা খুব গম্ভীর গলায় বোতলটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলছে - "আমি ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করি না। খেয়াল করি নি অচিনের সাথে গল্প করতে করতে যে ও বার দুএক ঢেলে বোতল টা খালি করে দিয়েছে। আমি ব্যাস্ত হলাম নভেন্দু'দা কে আমার বোতলটা এগিয়ে দিতে, আর ঠিক তখনি অচিনের আর একটা গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো মন্তব্য - "কিন্তু ছুঁচোটার তো স্বর্গলাভ হতে পারতো, ওই হাতে মরে।।" 

ঠা ঠা করে হেসে ওঠা নভেন্দু'দার দরাজ স্বর - ছাদের দু একটা পায়রা ঝট পট করে জায়গা বদল করল। "শুয়ার বোতল শেষ করে দিয়ে এখন রস ঢালছ..."  দু একটা আরও অশ্রাব্য অশ্লীল কথা, তারপর আমার বোতলে চুমুক।

নভেন্দু সেন। কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল। পাশ টাস করে বিয়ের পর প্রয়োজনের তাগিদে ষ্টীল সিটির স্কুলে আর্ট এর টিচার । আমাদের আর আমাদের মতো অনেকের জীবনে লোকটা ছিল এক ঐশ্বরিক উপস্থিতি। না প্রভার দ্যূতিতে নয়, প্রাণের। ছোটো খাট লোকটার ছিল অদম্য প্রাণশক্তি, আর সেটা খরচাও করত চার হাতে। ও ছিল আমাদের স্বপ্ন কারিগর, ও না হলে আমাদের আড্ডা খুব সহজেই মিইয়ে যেত। 

আমরা প্রায়ই মধ্যরাতের শেষ যামে বোতল খালি হলে তিন চারজন - শিবাজি আমি অচিন দেবাশীস অলক - আমরা যেতাম ওকে ওঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতে, অনেক সময় হয়েছে ওঁর বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডার মায়া কাটাতে পারছি না, আর তখন দোতলার জানলার ফাঁক দিয়ে একটা আওয়াজ আসত - আড্ডা টা শেষ করে আসলে হতো না এখানে, এ বাড়ির আর সবাই কেও কি ঘুমতে দেবে না তোমরা। ভদ্রমহিলা আসলে কি এক অদ্ভুত জীবনের চলার ছন্দে নভেন্দু'দার সব কিছুকেই মনে নিয়েছিলেন, মেনে নয়, আর তাই এতো অনাচারে অত্যাচারের পরেও আমরা কোনদিন তাঁর কাছে ব্রাত্য হই নি।

নভেন্দু'দা মারা যাওয়ার পর তাঁর কাছে যেতে পারিনি, সাদা কাপর পড়া তাকে দেখতে পারব না বলে। সাদা হয়ত উনি পরেন নি, কিন্তু নভেন্দু'দা ছাড়া উনি - সামনে যেতে পারি নি। ওঁর বড় মেয়ে ফোন করেছিল - কাকু আসবে না? বলেছিলাম - না রে পারব না...। মেয়েটাও নভেন্দু'দার মেয়ে তো নভেন্দু'দার মতই আর তাই অল্প হেসেছিল ফোনের ওপার থেকে - আচ্ছা।

ভেতরের যে বিশ্ব আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, কখনো কখনো সেটা এতো গুরুভার।

Saturday, March 3, 2012

মরণ দিয়েছে ডাক এস হে নাচা যাক


উলুধ্বনি খৈ আর খঞ্জনি, 
খাটখানা কাঁধে নিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে গেলো চার জন লোক;
সঙ্গে গেল একপাল কচি কাঁচা, উত্সাহি জো্য়ান মানুষ
স্মশানের দিকে
বল হরি হরি বোল -  
লাশটাও কালা হয়ে যেতে পারে
এমন চিত্কার শুনে ঘাঢ় ফেরাতেই 
বাতাসে ছিট্‌কে এলো একমুঠো খৈ আর খুচ্‌রো পয়সা
ইজের নেংটি আর ন্যাংটোর হুটো পুটি -
আস্টে পৃষ্টে দড়ি বাঁধা লাশটার নিশ্চি্ন্ত বিশ্বাষ
এমন হরি'র নাম, এমন হরি'র লুঠ, 
স্বর্গে তো যাবোই। 

প্রেতাত্মার প্রান ...

"অনেক দিন আগের কথা, বেনারসের ঘাটে বসে আছি, সেই সময়ের কথাগুলো ভাবলে বেশ রোমাঞ্চ হয়, মানে তখন আমি কলেজে পড়ি। সে সময়ে আমার একটা অভ্যেস ছিল মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ কারুকে কিছু না বলে  আমার ইচ্ছে গুলোর সাথে ইলোপ করা। তার মানে এই নয় যে একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতাম, কারন জানতাম যে তাহলে বাবা ইলোপ করার ইচ্ছের ঘরে তালা মেরে দেবে, তাই যোগাযোগ রাখতাম। সে সময়ে যোগাযোগ রাখার এত সুবিধা ছিল না, মোবাইলের নাম কেউ শোনে নি, এস টি ডি' ও হত না, ট্রাঙ্ক কল বুক করে টেলিফোনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত, অনেক সময়ে সেটা ম্যাচিউর করত না, তাই বেস্ট ভরসা ছিল টেলিগ্রাম। পোষ্টাপিসে গিয়ে ফর্ম ভরো আর পয়সা দাও, তার বাবু খট খটা খট টক টকা টক তারের বাদ্যি বাজিয়ে খবর পাঠিয়ে দেবেন, তো সেবারও খবর টবর দিয়ে নিশ্চিন্ত আছি। দশাশ্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যা, লোকে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসাচ্ছে, এধারে গুটিকয় দেহ দাউ দাউ করে জ্বলছে..." গেলাসের মৌতাতে আড্ডা টা বেশ জমিয়ে তুলেছিল অনির্বাণ, হঠাৎ আমার মনে হল আমিও তো এরকমই নিরুদ্দেশ হতাম, তবে সেটা অনেক পরে, মানে চাকরি করি তখন, সাবালক, বিয়ে থা করিনি, একটা রয়াল এনফিল্ড কিনেছি। আশির মধ্য ভাগের কথা, রাজীব গান্ধীর দৌলতে পাঁচ দিনের সপ্তাহ চালু হয়েছে, তো মাঝে মাঝেই শুক্রবার বিকেলে আফিসের পর শিবাজির সাথে নিরুদ্দেশে চলে যাই, সেরকমই একবার সোমবার ছুটি ছিল কেটে পড়েছি। সোমবার সন্ধেতে ফিরে দেখি মেসে তালা, কি আর করা একটা বোতল এনে আমি আর শিবাজি বসে পড়লাম, আড্ডা মারতে মারতে কখন দুজনেই মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়েছি, ভোর রাত্রে আমাদের রক্ষক অন্নদাতা ধনঞ্জয় ফিরল দেশ থেকে, বুঝলাম কিন্তু উঠিনি, তারপর ঘুমের ঘোর কাটল যখন শুনতে পেলাম নভেন্দু'দা জিজ্ঞেস করছে ধনঞ্জয় কে "ওরা কখন ফিরল" - তাতে তার উত্তর ছিল "ওরা তো ফেরেনি"।
পরে সে কথাটা নিয়ে আমাদের সে কি হাঁসা হাঁসি, সত্যি তো নেশার ঘর থেকে আমরা তো তখনো ফিরিনি।
তবে কথাটা ঠিক ওই ভাবে বলেনি ও। ধনঞ্জয় বৃহস্পতিবার বাড়ি গেছিলো, ফিরেছে মঙ্গলবার ভোরে, ও জানেই না আমরা এ কদিন ছিলাম না, তাই ও বলেছে আমরা তো যাই নি কোথাও, ফিরব মানে? তারপর নভেন্দু'দা বলেছিল তোমাদের খোঁজে আমরা প্রায় পুলিসে খবর দিচ্ছিলাম।
খেয়াল হল অনির্বাণ তখনো তার গল্প বলে চলেছে, নিজেকে কিরকম প্রেতাত্মার মত মনে হল, অতীতে ডুবে থাকা বর্তমান ছেড়ে - মৌতাতে আবার ডুবলাম

শীতের মধ্যে হঠাৎ


কোথাও কিচ্ছু নেই শীতের শুকনো আকাশে শীতটাও ঠিক নেই
হঠাৎ কোথাত্থেকে বেচটকা ঝড় হাওয়া
একঝাঁক বৃষ্টি ঘুরে গেল এই শহরের বুকে -
এদিক সেদিক রাস্তার ওপরে ভাঙ্গা ডাল, জমা জল
রিক্সার গুঁতোগুঁতি - বাস কিম্বা অটো নেই
দুজনেরই চটির অবস্থা যখন তখন।
এরপর দুজনেই চলে যাবে নিজেদের দিকে। 
একটু আগের সেই উসখুসে দুজনকে থমথমে 
কিছুটা বা উদবিঘ্ন দেখায়,
দুজনের চোখে শুধু ভাঙ্গা ডাল আর শুধু বৃষ্টির জল।
প্রেমিক প্রেমিকা নয়, বাস স্টপে 
ভিজবে না এই ভেবে দাঁড়ান মানুষ আর মানুষীর গল্প এটা ।
একটু বেশি বয়সের তাড়া বেশি তাই হাঁটা দিলো,
আজ শনিবার, ওষুধ কেনার দিন,
অফিস ফেরার পথে একটা পাকা পেঁপে - মা বলেছিল,
হন হন হাঁটার ফাঁকেতে এদিক সেদিক দেখা
কোথায় সাধের পেঁপে।
কমবয়সীর অতো তাড়া নেই,
নেই কেউ অপেক্ষায় যার কথা ভেবে হনহনে হাঁটা দেবে -
আজ তার ইচ্ছে সে গোটা শহরের কতজন ছাতাধারি 
বরষাতি গায়ে কতজন,
কজন বারান্দায় কতজন খুঁজে ফেরে মাথাটা গোঁজার ঠাঁই
সেসব গুনবে ঘুরে ঘুরে।
প্যান্ট ভেজা, চটিটাও প্রায় ছিঁড়ে গেছে,
তবুও যুবক, অসম্ভব জোরে হাঁটে -
অনেক গুনতি বাকি।
……………………………………………………………………

নাদের আলি - আর কেউ খোজে না তোমাকে



সুনীলের হাহাকার লোক টা কি শুনেছিলো?
"নাদের আলি আমি আর কতো বড় হবো, আমার মাথা এ ঘরের..."
লোকটা কেমন  ছিল, নাদের আলি?
পারানির মাঝি ছিল? বহুবার এ পাড় ও পাড় 
ঘাট থেকে ঘাটে নিয়ে যেত?
নিজের কাজের মাঝে বরাভয় বন্ধু হয়ে 
মাছ, পাখি, জল আর আকাশ চেনাত'?
নদীর চড়ার গাছ, কাশ ফুল, ঝিলমিলে জল
এসব দেখাতে নিয়ে,
(নাকি আরও বেশি দিত কিশোরকে স্বাধীনতা ?)?????
কখনো হঠাৎ বৈঠাটা তুলে দিত হাতে
নাও,  দাঁর বাও! 
তারপর হুঁকো টায় আগুন ধরিয়ে গলুইয়ের কোনে বসে
সুখটান দিত?
নাকি ছিল বাগানের মালি, কিম্বা ঘোড়ার সহিশ ?
বাপ কাকা জেঠা দের নজর এড়িয়ে 
গাছেতে চড়তে দিত?  কিম্বা ঘোড়ার পিঠে ?
চাবুকটা হাতে দিত সাবধান করে ?
"একদম চালাবে না”!
কিশোর তাতেই খুশি, বড়দের দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় পেয়ে!
এভাবেই একদিন ৪৭ পেরিয়ে তারা এ পার ও পার
মাঝে কাঁটাতার - ও পারে নাদের আর এ পারে সুনীল!
পদ্মদীঘির বিল - হায়রে সুনীল;
নাদেরও কি কষ্ট পেয়েছিলো সুনীলের হাহাকার শুনে ?
এরকম বহুবার ঘটে গেছে পৃথিবীর বুকে,
উপলক্ষ কিছু পেলে লাগে নি সময়
টেনে দিতে আড়াআড়ি মানুষের বুকে কাঁটাতার,
প্রিয়জন এ পার ও পার,
থেকে গেছে শুধু হাহাকার!


..................................................................

(কিছুদিন আগের কবিতা - ২০১১ মার্চ)