Saturday, September 15, 2012

বশিষ্ঠের অপেক্ষা


বশিষ্ঠ অপেক্ষায় অক্লান্ত যুগ জিজ্ঞাসাভুলে গেছে পাশা খেলা...ভুলে গেছে বিবস্ত্রা দ্রৌপদী...সময় এখন তাই ধিকৄত নির্বাসনে আছে।

 বশিষ্ঠ না দ্বৈপায়ন...কে যেন  প্রশ্ন তুলল!

একটা ছোটো গল্প আছে - বলি তাহলে - একবার রাজর্ষি নিমি তার যজ্ঞের পুরোহিত হওয়ার জন্য বশিষ্ঠ কে অনুরোধ করতে এলেন, তো তখন আলরেডি বশিষ্ঠ এনগেজড ইন্দ্রের যজ্ঞে। ফলে নিমির রাজসূয় যজ্ঞে পৌরোহিত্যের জন্য সময় চাইলেন, নিমি কে অপেক্ষা করতে বললেন, হাতের কাজ টা সেরে নিয়ে যাবেন বলে - মানে ইন্দ্রের যজ্ঞ সেরে। তো তখনকার দিনে তো ব্রাহ্মণত্ব আর ক্ষত্রিয়ত্ব নিয়ে একটা ব্যাপার ছিলই - কে বড় ইত্যাদি। তো বশিষ্ঠ ভাবলেন আমি অপেক্ষা করতে বলেছি, যাবে কই, অপেক্ষা করবে মানে নিমির যজ্ঞ বশিষ্ঠের জন্য অপেক্ষা করবে।

ইন্দ্রের যজ্ঞ সেরে ফিরে এসে দেখলেন নিমি অনেক আগেই চলে গেছে, আর শুধু তাই নয়, গৌতম ঋষি কে দিয়ে যজ্ঞ করিয়েও ফেলেছে - নাকি চলছে। রাগে অগ্নিশর্মা ব্যাস অভিশাপ, নিমি কে বললেন যে চেতনার ভ্রষ্ট উপরোধে তুমি ব্রাহ্মণ কে অপমান করলে, সেই চেতনাই তোমার চলে যাবে, তুমি জড়ভরত হয়ে যাবে। তো নিমিও তো যজ্ঞ টজ্ঞ করে ব্রাহ্মণ আর ভগবান ভজিয়ে কিছু পুণ্য সঞ্চয় করেছিলেন, জড়ভরত হবার আগে দিলেন পাল্টা অভিশাপ - যে উন্মাদ রাগের বসে তুমি এ কাণ্ড করলে সে তো ঋষি বা মুনির কাজ নয়, সেটা বশিষ্ঠ রুপী মানুষটার কাজ - সে শরীরটার কাণ্ড, আর তাই তুমিও শরীর বিহীন আত্মা হয়ে যাবে। ব্যাস তারপর দুজনেরিই ঝামেলি'র শুরু -   একজন জড়ভরত আর একজন কায়াহীন ছায়া।

এদিকে কুকম্ম করে ফেলেই তো বশিষ্ঠ বুঝেছে ঠেলাটা, ফলে দৌরদৌরি শুরু ব্রহ্মা আর বিষ্ণুর কাছে দরবার - দেহ দাও। ব্রহ্মা আর বিষ্ণুও ধড়িবাজ - এত সহজে,  দাঁড়াও। শেষমেশ নাছোর বশিষ্ঠের কাছে হার মেনে দুজনেই বলল ঠিক আছে আপনি গিয়ে অমুক জায়গায় একটা কুন্ড বানান তার নাম হবে বশিষ্ঠ কুন্ড।  আমরা এসে তাতে জল ভরব, আর সে জলে চান সারলেই কেল্লা ফতে - শরীর আসবে। বশিষ্ঠ তো জায়গামত গিয়ে - আত্মা হলে হবে কি তেজ তো আছে, সেই তেজবলেই কুন্ড বানাল, ব্রহ্মা আর বিষ্ণুর দেখা নেই, বশিষ্ঠ অপেক্ষায় আছে। বেশি ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই ও করতে পারছেনা, শরীর বলে কথা। সেই অনন্ত অপেক্ষার পর ওঁরা দুজন এলেন, তারপর তো গল্প শেষ মানে বাদ বাকি হল মায় শরীর লাভ অব্দি।

যুগ জিজ্ঞাসা গুলোও ওই বশিষ্ঠের তেজের মতই তীব্র, তীক্ষ্ণ কিন্তু কায়াহীন আর তাদের অক্লান্ত ব্যাস্ততা সেই কায়ার খোঁজেই। নিজের শরীর নিয়ে এতো আত্মলীন হয়ে আছে সেই জিজ্ঞাসা যে বাস্তবের সাথে যোগাযোগ নেই, আর তাই সময় ..।

কবিতার কথাতেই বলি সেই কায়াসন্ধানই  তো চলছে -  জিজ্ঞাসার নামে এক একটা বশিষ্ঠ অপেক্ষা - কায়া পাওয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে - আজও এখনও -  তীব্র সে জিজ্ঞাসা তীক্ষ্ণ বটে কিন্তু ...

শুধু নিঃশ্বাসের চেতনায় চিন্ময় হলেও মুর্তিগুলো মাটিহীন 
মাটি চাই সে মাটির রূপ চাই টান চাই চোখের আদল চাই 
যদিও অরন্য ঝড় হা হা করে হেসে ওঠে পাগলের মত 
সে অরন্য মাটিতে প্রথিত হোক - "Avatar"  অরন্য নয়
শুধু ছেঁড়া ফুর্তির মত উলঙ্গ উল্লাস নয়
দ্রাক্ষারস মদ মাংস হাহাকার হা হা হাঁসি 
সভ্যতার রক্তস্নানে মেতে উঠে রক্তধারা পান হোক
অন্ধকার হামাগুড়ি অপেক্ষার ঈগল শুন্যতায় ভেসে থাক
কামনা ছড়ানো থাক ভুজঙ্গ নিঃশ্বাসে

অর্থ - চিন্তা - সহজপ্রকৃতি


কিছু লিখছিলাম একটা পাতায় - তো লিখতে লিখতেই আরও কিছু কথা মাথায় এল - নাকি ছিল, ভেসে উঠল। সে ছাই যেটাই হোক আরও কিছু ছাই পাঁশ এলই যখন ছাঁকনি দিয়ে তুলে রাখি -

এক্সিস্টেন্সিয়ালিস্ম আজকের যুগের নিরিখে যে ছাপটুকু রেখে গেছে সেটা একাদিক্রমে ঐতিহাসিক সুত্রেই ভেবে চলেছে একটু ভিন্ন আঙ্গিকের রঙ নিয়ে  যে লাইফ ইস মিনিংলেস, ইউনিভারস ইস পারপাসলেশ আর সোসাইটি বা সময় এর কথাও বলাই বাহুল্য ...সমাপতনে  শেষ যখন আসে সেই শেষ ততটাই অর্থপূর্ণ বা অর্থহীন  যতটা এই জীবন ছিল। দারুন নাকি নিদারুন। মজা এইটাই যে যতটা বোল্ড বা কারেজিয়াস হোক না কেন অ্যাজ এ প্রেসেন্টেসান এই বোধ টা -  it does not seem to provide succor either  to the  one who is a sufferer or to the mind that has presented it. Then why  present such things. 

আর এইখানেই এসে পড়ে এই অর্থ খোঁজার ধরন বা পদ্ধতির প্রসঙ্গ । এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে জীবনের ইমপ্লিসিট অর্থ কখনই এরকম নয়। সেটা অনেক বেশী ইন্সটিঙ্কটিভ আর জীবনের অন্যান্য দায়ের সঙ্গে যুক্ত - যেখানে যাপন জড়িয়ে আছে, একদিকে নিড আর অন্যদিকে ডিসায়ার, একদিকে প্রয়োজন যা কিছু আবশ্যক আর অন্যদিকে স্পৃহা অভিলাষ আকাঙ্খা কামনা আর তার টানাপোড়েনের থেকে সেই অর্থের পশ্চাদ্ধাবন । ওইখানে সে বাঁচে, সে হয়ে ওঠে সেই এক সামাজিক জীব যে পারিপার্শ্বিকের মধ্যে ক্রমাগত নিজেকে ফিট আরও ফিট করে চলেছে তার জীবনের ইন্সটিঙ্কটিভ অর্থ খোঁজার ছন্দে।

কিন্তু সে তো সবটাই সেই সামাজিক জীব নয়, কিছুটা হলেও নিজেকে নিয়ে নিজের জন্য যাকে বলে সেই ডারউইনিয় প্রোটোপ্লাস্মিক এন্টিটি, যে ইভল্ভ করে বা করবার প্রথাসিদ্ধ কতগুলো পন্থায় ব্যাপৃত থাকে। শিল্পাচার। 

সেখানে শুরু রিফ্লেকটিভ মিনিং বা চিন্তাশীল অর্থের দ্যোতনাময় উপস্থাপনা বা নিবেদন বা উপহার - যাই নাম দেওয়া যাক, আর সে সেটা রাখে তার সেই প্রথাসিদ্ধ পন্থার মোড়কে, তার শিল্পাচার। আমরা নাম দিই স্টাইল। আর এইখানেই এটা একটু কমপ্লিকেটেড আর দুর্বোদ্ধ হয়ে যায় সময়ে সময়ে। এই চিন্তাশীল  অর্থবোধ সাধারনত সেই ডারউইনিয় প্রসেস অফ সিলেক্সান আর রিজেক্সানের মধ্যে দিয়ে আসে না বা সেই তত্ত্বের অমোঘতার শেকলে বাঁধা নয়। তা যদি হত তাহলে যে এক্সিস্টেন্সিয়াল ডোমেন এর অবধারন বা বোধের থেকে সে তার জৈবনিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে সামাজিক জীব হিসেবে ইভল্ভ করে সেই ইভল্ভ করার প্রবৃত্তি টা থাকা স্বাভাবিক ছিল। চিন্তাশীলতার ইভল্ভ করার কথা।  যেখানে করে সেখানে সব কিছুকে নিয়ে সব কিছু সত্ত্বেও সে চর্চা জীবনকে ছুঁতে চায়, জয়গানের কথা বলছি না, ছুঁয়ে থাকার কথা বলছি।     আর যেখানে ইভল্ভ করে না সেখানে শুধুই চিন্তা শুধুই আশ্লেষ শুধুই উদ্বেগ শুধুই তার মাঝে নিরলম্ব অবস্থান। 

কথা হচ্ছে তাহলে এর পারপাস টা কি? শধু আমার অর্থেই আমার জীবন কোথায় দাঁড়াল? আদৌ দাঁড়াল কি? অনেক প্রশ্ন সেখানে ভীড় করে। আমি আমার মত করে একটা উত্তর পেয়েছি। এখানে দর্শন মানে চিন্তাশীলতা আমি'ময় হয়েছে এতটাই যে আমিই চার্বাক আর জীবন প্রায় নির্বাক শুধু তার অ্যানক্সাইটির রুপের দায়ভাগের  অস্তিত্ব টুকু টিকে আছে। শিল্পচর্চা শিল্পবোধ শিল্পচর্যা প্রতিষ্ঠিত হয়, জীবন নয়। এবং যে যুক্তি এর সপক্ষে দেওয়া হয় বা যে কথা বলা হয় সেই সুত্রে তা হল - জীবন তো অনেকটাই অর্থহীন তাহলে সে প্রতিষ্ঠিত হয় কি করে! বা তাকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কি করে। আর তাই উঠে আসে শুধু রুপবিন্যাসের কথকথা। সে কথকথাই বা কতটা জোরালো প্রশ্ন থেকেই যায়!

আমি রুপে তোমায় ভোলাবনা
ভালোবাসায় ভোলাব
আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলবনা গো
গান গেয়ে ...

রূপ গুণ নয়, তাই তো শব্দ দুইখান  - রূপ আর গুণ। তো গুণ যেখানে নেই সেখানে ভুলতে হয় রুপে ভোলো,  আর না ভুললে তফাৎ যাও, তোমার গোত্র আলাদা,  চিন্তাশীলতায়  অর্থ খোঁজার গোত্র।  প্রবচন - "অধিকাংশ রুপসীর হাঁসির শোভা মাংশপেশীর কৃতিত্ব, তার হৃদয়ের কৃতিত্ব নয়"... মস্তিস্কের মাংসপেশীর। হৃদয়ে হৃদয় নেই হৃদপিণ্ডে হৃদরোগ জবর দখলী - বিনিময়ে আমি শুধু কিছু তাপ দিতে পারি যা কিনা জ্বরের বিকার - যা দেখছ আমায় সময় দিয়েছে  আমার কি করার ছিল। সত্যিই তো - 

আমি মরালিস্ট নই তাই মন্দ ভালোর  বিচার করবো না । আমি ভলতেয়ার নই তাই ঠিক ভুলের পর্যালোচনার হিম্মত রাখি না। সুন্দর অসুন্দর নিয়ে কিছুটা মাথা ঘামাই কারন সেটা প্রাকৃত নিয়ম । 

আর তাই হুমায়ুন আজাদের কবিতার মতই বিশ্বাস করে যাব -

তুমিই সৌন্দর্য আজও দুই চোখে (হে জীবন) তোমার ধ্যানেতেই আছি মগ্ন অহর্নিশ
পরিমাপ করে যাই অনন্ত দ্রাক্ষার উৎস ঢালতে পার কতখানি বিষ...